ভাষা মানবসমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার কিনা বলা যায় না। বিভিন্ন প্রজাতির জীবেরও নিজস্ব ভাষা আছে। তবে একথা নিশ্চিতরূপে বলা যায় যে আগুন বা চাকার মত মানবজাতির একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার লিপি। বস্তুতঃ লিপির আবিষ্কারেই প্রথম শ্রুতি ও স্মৃতিশাস্ত্র থেকে আরো যথাযথভাবে তথ্য সংরক্ষণের সুযোগ পেলো।

এ তো গেলো লিপির প্রয়োজনীয়তার কথা। প্রয়োজনীয়তার স্বার্থেই লিপির সৌন্দর্যের দিকে নজর দিতে হয়। ভালোভাবে পড়ার জন্য লিপিকে হতে হয় সুখপাঠ্য। আলাদা করে চেনার সুবিধার্থে বর্ণগুলোর মধ্যে যথেষ্ঠ বৈসাদৃশ্য থাকতে হয়। চোখের শান্তির জন্য সাদৃশ্যও প্রয়োজনীয় খুব। এই সৌন্দর্যবোধের জায়গা থেকেই ‘বাংলা ফন্ট লাইব্রেরি’র উত্থান।

প্রাকৃত থেকে উৎসারিত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের এই ভাষাটি বরাবরই ব্রাত্যজনের ভাষা। পূর্বে সংস্কৃত ও পরবর্তীতে মুসলিম শাসনামলে ফার্সি ও উর্দুর প্রতাপে তা ব্রাত্যজনেরই থেকে যায়। ভারতবর্ষে পর্তুগীজরা মুদ্রণযন্ত্র আনার পর চার্লস উইলকিন্সের হরফে ১৭৭৮ সালে মুদ্রিত হয় ব্রাসি হ্যালহেডের ‘A Grammar of the Bengal Language’। তারপর বিভিন্ন সময়ে বাংলা মুদ্রণের ওপর কাজ করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুরেন্দ্রচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ। বাংলা সাহিত্যের বহুল প্রচার ও প্রসারের শুরুটা এইসময়েই। অফিস আদালতের দলিল-দস্তাবেজের জন্য দরকার ছিল বাংলা টাইপরাইটার। সেটি তৈরী করেন মুনির চৌধুরী। কম্পিউটার সহজলভ্য হওয়ার পর ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক মুদ্রণের পার্থক্য অনেকটাই ঘুচে গেলো। সেইসময়, কম্পিউটারে বাংলা লেখার প্রথম ব্যবস্থা ছিল ১৯৮৪ সালে সাইফ উদ দোহা শহিদের ‘শহিদলিপি’, পরবর্তীতে মুদ্রণে একচেটিয়া জায়গা দখল করে ‘বিজয়’। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ইউনিকোডের বহুল ব্যবহারের ফলে বাংলা ইউনিকোড ফন্ট ছিল খুবই জরুরি। ইউনিকোড ফন্টে ব্যক্তিউদ্যোগে কাজ করেছেন অনেকে। খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ‘একুশে’ ও ‘অভ্র’ টীম।

বাংলা লিপির সংরক্ষণ ও উৎকর্ষসাধনের এই ঐতিহাসিক পরম্পরার একটি ধাপ হতে যাচ্ছে ‘বাংলা ফন্ট লাইব্রেরি’। একদিকে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে শিল্পী ও ফন্ট তৈরীতে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের আরো ভালো ফন্ট তৈরীতে উৎসাহিত করা, অন্যদিকে গণমানুষের মধ্যে আরো বৈচিত্রময় ফন্ট তুলে ধরতে আমাদের এই প্রচেষ্টা।